মশাবাহিত ক্ষতিকর ৫টি রোগ।যা আপনার জন্য ভয়াবহ বিপদ বয়ে আনতে পারে।মশার কামড় থেকে যেসব রোগ হয় সেগুলোর মধ্যে আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ম্যালেরিয়া।
গত কয়েক বছরে মশার কামড়ে সৃষ্ট ডেঙ্গু রোগটিও আমাদের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে মশা বাহিত যে রোগটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তা হচ্ছে চিকনগুনিয়া। কিন্তু এগুলো ছাড়াও আরো অনেক রোগ রয়েছে যেগুলো মশার কামড়ে আমাদের শরীরে ছড়াচ্ছে এবং অত্যন্ত ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে।
mosquito,মশাবাহিত ক্ষতিকর
মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে এক সময় বাংলাদেশে ম্যালেরিয়াই বেশি পরিচিত ছিল৷ তখন এই ম্যালেরিয়া আতঙ্ক ছিল ঘরে ঘরে৷ এখনো বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় ম্যালেরিয়ায়ার প্রাদুর্ভাবের কথা শোনা যায়৷ সেখান থেকে মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়৷ তারপর আসে ডেঙ্গু৷ এই ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী হলো এডিস মশা৷ ডেঙ্গুর পরে এখন চলছে চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব৷ এই জ্বরে বাংলাদেশে কেউ মারা গেছে বলে চিকিৎসকরা স্বীকার না করলেও,এ রোগ ভোগাচ্ছে মানুষকে৷ হাড়সহ শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যাথায় কাতর হচ্ছেন আক্রান্তরা৷চিকুনগুনিয়ানাকি আফ্রিকান ভাষা৷ আর এর অর্থ হচ্ছে,ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যাওয়া৷ আসলেই ব্যাথায় ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যাচ্ছেন রোগীরা৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন,চিকুনগুনিয়াসহ তিন ধরনের রোগের জন্য দায়ী এডিস মশা৷ এই মশার প্রজনন ঘরবাড়িতে৷ তারা কামড়ায় দিনের আলোতে৷
আকারে ছোট হলেও পৃথিবী জুড়ে অত্যন্ত ভয়ংকর একটা প্রাণী হচ্ছে মশা। প্রতি বছর মশার কামড়ে অর্থাৎ মশার কামড় থেকে সৃষ্ট রোগে লাখ লাখ মানুষ মারা যায় বলে জানিয়েছে বিশ্ব বিখ্যাত স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো। মশা থেকে সৃষ্ট রোগ ম্যালেরিয়া থেকেই গত বছর পৃথিবী জুড়ে ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার লোক মারা গিয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অর্গানাইজেশন (WHO)।
তাহলে চলুন জেনে নিই রোগ গুলোর আদ্যোপান্তঃ
১. ম্যালেরিয়া
মশার কামড় থেকে যেসব রোগ হয় তার মাঝে ম্যালেরিয়া অন্যতম।এটি মানুষের জন্যে একটি প্রাণঘাতি রোগ। প্লাজমোডিয়াম নামক এক ধরণের পরজীবি থেকে এই মারাত্মক রোগটির সৃষ্টি হয়। আর বিশেষ এই পরজীবিটি বহন Anophelesনামক স্ত্রী মশা যার কামড় থেকে আমাদের শরীরে এটি ঢুকে পড়ে।
মশার কামড়ের সাথে সাথে প্লাজমোডিয়াম পরজীবিটি আমাদের শরীরে ঢুকে সরাসরি লিভারে চলে যায়। আর অল্প সময়ের মধ্যেই বংশ বিস্তার শুরু করে। অর্থাৎ একটা প্লাজমোডিয়াম থেকে অসংখ্য প্লাজমোডিয়ামের সৃষ্টি হয় এবং সেগুলো মূলত আমাদের রক্তের লোহিত কণিকায় আক্রমণ করে। ফলে, জ্বর, মাথা-ব্যাথা এবং বমির মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
জ্বর বা মাথা-ব্যথার তীব্রতা নির্ভর করে কি ধরণের প্লাজমোডিয়াম থেকে ম্যালেরিয়া হয়েছে তার উপর। প্রকৃতিতে প্রায় ১০০ ধরণের প্লাজমোডিয়াম পরজীবি রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে ৫টি রয়েছে মশার শরীরে। আর মশার কামড় থেকে এই ৫টির যে কোনটিই ঢুকে পড়তে পারে আমাদের শরীরে। ভিন্ন ভিন্ন পরজীবির কারণে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণও দেখা দিয়ে থাকে। তবে চিন্তার কিছু নেই ম্যালেরিয়া দমনে নতুন ধরণের টিকা আবিস্কৃত হয়েছে।
২. জাপানিজ এনসেফালিটিস
নাম দেখে মনে করবেন না যে এ রোগটি কেবল জাপানেই হয়। বরং মশার কামড় থেকে সৃষ্ট এ রোগটি পৃথিবীর সব দেশের মানুষের মাঝেই হয়। এনসেফালিটিস এক ধরণের মস্তিস্ক প্রদাহ আর এটি ১৯৯১ সালে সর্ব প্রথম জাপানেই আবিস্কৃত হয়েছে বলে এর নাম জাপানিজ এনসেফালিটিস।
যে সব দেশে প্রচুর পরিমাণে ধান হয়,এ রোগটি সেসব দেশেই বেশি দেখা যায়। অর্থাৎএ রোগের জন্যে দায়ী ভাইরাস,জে.ই মূলত ধান গাছে জন্ম নিয়ে থাকে। এছাড়াও,খড়কুটো এবং যে কোন গাছের পাশে আবদ্ধ পানিতেও জে.ই ভাইরাস জন্ম নেয়।
প্রায় সব ধরণের মশাই এই ভাইরাসটি বহন করে থাকে। আর মশার কামড়ের মাধ্যমে যখন মানুষের শরীরে এই ভাইরাসটি প্রবেশ করে,তখন সেটি সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে গিয়ে আক্রমণ করে থাকে। যারফলেমানুষের মস্তিস্ক এবং স্পাইনাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
৩. ডেঙ্গু জ্বর
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসের নাম আর এই ভাইরাস থেকে সৃষ্ট জ্বরকেই ডেঙ্গু জ্বর বলে। মশার কামড় থেকে যেসব রোগ হয় সেগুলোর মধ্যে এটি অত্যন্ত পরিচিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এডিস অজিপ্তি নামক স্ত্রী মশা থেকে আমাদের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস ঢুকে থাকে। তবে,অল্প ক্ষেত্রে হলেও অ্যালবোপিকটাস নামক আরেকটি স্ত্রী মশা থেকেও ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে।
ডেঙ্গু জ্বর হলে সাধারণত জ্বরের উচ্চ প্রকোপের সাথে সাথে মারাত্মক মাথা ব্যাথা,হাঁড় ও মাংশপেশীতে ব্যথা এবং মাঝে মাঝে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীর ছোট ছোট রক্তনালিগুলোর মধ্যে কোন কোনটি যদি লিক হয়ে যায় আর সেখান থেকে পেট ও ফুসফুসে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে, তখনই নাক দিয়ে রক্ত বেরোতে শুরু করে।
কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে আরো মারাত্মক অবস্থা,যেমন ডেঙ্গু হেমোর্যাজিক জ্বর দেখা দিতে পারে। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর কিংবা হেমোর্যাজিক ডেঙ্গু জ্বর উভয় অবস্থাতেই দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। নচেৎ রোগীকে বাঁচানোই কঠিন হয়ে যাবে। আর চিকিৎসার পাশাপাশি পুরোপুরি রেস্ট নেয়াই হচ্ছে ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়।
প্রতি বছর পৃথিবী জুড়ে ৩৫০ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩৫ কোটি লোক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এর মাঝে প্রায় ৯৬ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৬০ লক্ষ লোক মারাত্মক অবস্থায় পড়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পৃথিবীর ট্রিফিক্যাল এরিয়াগুলোতে এ রোগটি বেশি দেখা দেয়। যেমন আফ্রিকা,এশিয়া,প্যাসিফিক আইল্যান্ড,সেন্ট্রাল সাউথ আফ্রিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চল।
৪. চিকনগুনিয়া
মশা থেকে সৃষ্ট আরেকটি মারাত্মক রোগ হচ্ছে চিকনগুনিয়া। যেসব মশা এডিস অজিপ্তি এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস মশা দ্বারা ইনফেকটেড হয়,সেসব মশার কামড় থেকেই আমাদের শরীরে চিকনগুনিয়া দেখা দেয়। এডিস অজিপ্তিকে ইয়ালো ফিভার মসকিটো আর এডিস অ্যালবোপিকটাসকে এশিয়ান টাইগার মসকিটো বলা হয়ে থাকে। এ দু’টির যে কোনও একটি মশা থেকে যদি একটি সাধারণ মশা আক্রান্ত হয়।আর ঐ মশাটি যদি মানুষের শরীরে কামড় বসায়।তবে অবশ্যই তার চিকনগুনিয়া হয়।
চিকনগুনিয়া একটি মশা বাহিত ভাইরাস আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর জ্বর ও জয়েন্ট পেইনের মতো লক্ষণ দেখা যায়। আরো লক্ষণের মধ্যে রয়েছে মাথা ব্যাথা ও মাসল পেইন। সেই সাথে শরীরে ফুসকুড়ি উঠা।
সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসার মাধ্যমে আক্রান্ত রোগী ভাল হয়ে যায়। তবেজয়েন্ট পেইনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সুস্থ্য হতে এক মাসের মতো লেগে যেতে পারে। সাধারণত ছোটরা আর বৃদ্ধরা চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে কিছুটা রিস্কে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অর্গানাইজেশনের জরিপ অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রতি ১০০০ জন চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর মাঝে এক জন মারা যায়।
২০১৩ সালে সর্ব প্রথম আফ্রিকায় চিকনগুনিয়া ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত চিকনগুনিয়ার কোন ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। তবে, বিশ্ব বিখ্যাত প্রায় সব মেডিকেল অর্গানাইজেশনগুলোই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আপাতত: রোগটি চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও চিকনগুনিয়ার প্রকোপ থেকে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই।
৫. জিকা ভাইরাস
জিকা ভাইরাসও মশার মাধ্যমেই আমাদের শরীরে প্রবাহিত হয়ে থাকে। আর এ ভাইরাসটিও এডিস মশা থেকেই আসে। তবেজিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তেমন বড় ধরণের কোন লক্ষণ দেখা দেয় না। কেবলহাল্কা জ্বর,মাথা ব্যাথা,আর হাঁড় ব্যাথাই মূল লক্ষণ এবং এগুলো চিকিৎসার মাধ্যমে খুব দ্রুত সেরে যায়।
তবেঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা হয় জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যেসব শিশুরা জন্মগুতভাবেই মায়ের শরীর থেকে জিকা ভাইরাস বহন করে থাকে। ঠিক এ কারণেই জিকা ভাইরাসকে গ্লোবাল পাবলিক হেলথ্ ইমার্জেন্সি হিসেবে ঘোষণা করেছে ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অর্গানাইজেশন।কারণমেডিকেল সায়েন্স প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে,জিকা ভাইরাস Microcephalyনামক এক ধরণের দূর্লভ নিউরোলোজিক্যাল ডিজঅর্ডার তৈরি করে। যারফলে,জন্মক্রুটি নিয়ে অনেক শিশু পৃথিবীতে আসে। বিশেষ করে,এ ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের গর্ভ থেকে যে শিশুর জন্ম হয় তার মাথা অনেক ছোট থাকে এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় না।
এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তবেঅচিরেই হবে বলে আশাবাদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মেডিকেল অর্গানাইজেশনগুলো।
